ইসলামী ব্যাংকিং-এর অগ্রগতি : সমস্যা ও সম্ভাবনা (১ম পার্ট)


[শেখ ছালেহ কামেল ১৯৪১ সালে মক্কা নগরীতে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি সঊদী আরবের বিখ্যাত আল-বারাকা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বত্বাধিকারী। রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস অনুষদ থেকে গ্রাজুয়েট শেখ ছালেহ কামেল কর্মজীবনে দীর্ঘদিন যাবৎ সঊদী সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬৯ সালে তিনি আল-বারাকা গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে সঊদী আরবের একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ২০০৮ সালে বিত্তশালী আরব ব্যবসায়ীদের তালিকায় তাঁর অবস্থান ছিল দ্বাদশতম। শুরু থেকেই প্রচলিত সূদভিত্তিক ব্যাংকিং পদ্ধতিকে ইসলামীকরণের ব্যাপারে তাঁর ছিল ব্যাপক আগ্রহ। এজন্য ১৯৭৬ ও ১৯৭৯ সালে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ইসলামী অর্থনীতি ও ইসলামী বীমার উপর দু’টি গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮২ সালে তিনি বিশ্বব্যাপী ইসলামী ব্যাংকিং ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে গঠন করেন আল-বারাকা ব্যাংকিং গ্রুপ, যা ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধতির প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে ছিল এক অনন্য মাইলফলক। এ ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখার কারণে শেখ ছালেহ কামেলকে ‘সমসাময়িক ইসলামী অর্থনীতির জনক’ আখ্যা দেয়া হয়। বিগত কয়েক দশকে তিনি ‘সেন্ট্রাল কাউন্সিল ফর ইসলামিক ব্যাংকস’সহ ইসলামী ব্যাংক বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইসলামী ব্যাংকিং-এ অবদান রাখার জন্য ইতিমধ্যে তিনি লাভ করেছেন বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা পুরস্কার। অদ্যাবধি তিনি ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সাথে সাথে ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধতির উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ইসলামী ব্যাংকিংয়ে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৭ সালে তাঁকে ‘ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি)’ পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কার গ্রহণ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি যে মূল্যবান ভাষণ প্রদান করেছিলেন, তাতে ইসলামী ব্যাংকিং সংক্রান্ত নানা সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা প্রকাশ পেয়েছে। বক্তব্যটি ১৫ বছর পূর্বের হলেও প্রাসঙ্গিকতার বিচারে আজও তা যথেষ্ট গুরুত্বের দাবী রাখে। নিম্নে তাঁর ভাষণটি[1]ইংরেজী থেকে অনুবাদ করে উপস্থাপিত হ’ল]।

প্রিয় সহকর্মীবৃন্দ!

গতকাল আমি ‘আরব ব্যাংকার্স ফেডারেশন’ প্রদত্ত ‘আরব ব্যাংকার্স’ পুরস্কার গ্রহণের জন্য আমার সম্মানে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। সত্যি বলতে কি এই পুরস্কারের ব্যাপ্তি আমি, আমার অবদান বা আমার প্রতিষ্ঠানসমূহকে ছাড়িয়ে গেছে। এটি মূলতঃ স্বনামধন্য একটি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান থেকে গত দু’দশক ধরে সম্প্রসারমাণ ইসলামী ব্যাংকিং-এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও এর সফল কার্যক্রমের জন্য প্রদত্ত অনন্য স্বীকৃতি। যার অবদান এবং অর্জনসমূহ আরব ও ইসলামী বিশ্ব জুড়ে পরিব্যাপ্ত এবং সর্বত্র মানব সেবায় নিয়োজিত।

আজকের এই স্বপ্নসৌধ যা ইসলামী প্রকল্পের প্রতি মুসলিম উম্মাহ্র গভীর আকর্ষণ ও তা বাস্তবায়নের প্রতি গভীর আগ্রহ এবং একে সঠিক মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত করার প্রতি আমাদের স্কলার ও বুদ্ধিজীবীদের ত্যাগ ও ব্যবসায়ী মহলের চেষ্টা-প্রচেষ্টার স্পৃহাকে প্রতিনিধিত্ব করছে, সেখানে আমাকে দেয়া এই সম্মাননাকে আমি তাদের জন্য এক বিশেষ স্বীকৃতি মনে করি, যারা তাদের চিন্তা-চেতনা দিয়ে, অর্থ-সম্পদ দিয়ে ইসলামী ব্যাংকিং-এর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। সময়ের হিসেবে এর ব্যাপ্তি দুই দশক হলেও এর পিছনে রয়েছে বহু বছরের শ্রম ও অধ্যবসায়। আমি এই সম্মাননাকে হৃষ্টচিত্তে স্বাগত জানাচ্ছি। আমি আশাবাদী এ পুরস্কার ইসলামী ব্যাংকিং-এর উন্নয়ন ও বিকাশে আমাদেরকে অধিকতর ত্যাগ স্বীকারে প্রেরণা ও উৎসাহ যোগাবে।

তবে আমি আপনাদেরকে স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, এই সম্মান আমার জন্য আরো অধিক গর্ব ও সন্তুষ্টির কারণ হবে, যেদিন ইসলামী ব্যাংকসমূহের মৌলিক ধারণা ও বুনিয়াদী কর্তব্য তথা দেশের উন্নয়ন, বেকারত্ব দূরীকরণ, দরিদ্রদের সমৃদ্ধি আনায়নের মহান উদ্দেশ্যসমূহ, যা আমরা জনগণকে দিয়েছিলাম, তা পূরণে আমরা সক্ষম হব।

প্রিয় ভ্রাতৃমন্ডলী!

সেদিন এখন আর নেই যেদিন মানুষ অর্থনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালনায় কোন উচ্চতর নৈতিক আদর্শের উপস্থিতি স্বীকার করত না। আজকের দিনে আমরা সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সেসব মূল্যবোধের সন্ধান পাই, যা আল্লাহ মানবজাতির জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং আম্বিয়ায়ে কেরাম অনাদিকাল থেকে যা প্রচার করে এসেছেন। হযরত শু‘আয়েব (আঃ) স্বীয় কওমকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘তোমরা সঠিকভাবে পরিমাপ কর এবং যারা মাপে কম দেয়, তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। আর সঠিক ওযন কর। তোমরা লোকদেরকে তাদের প্রাপ্যবস্ত্ত কম দিয়ো না এবং যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করো না (শো‘আরা ১৮১-১৮৩)। তখন তাঁর কওম তাকে ঠিক তাই-ই বলেছিল, যা আজকের লোকেরাও বলে থাকে। ‘তারা বলল, হে শু‘আয়েব, তোমার ছালাত কি তোমাকে এই নির্দেশ দেয় যে, আমাদের পিতৃপুরুষগণ যাদের উপাসনা করত, আমরা তাদের পরিত্যাগ করি? অথবা আমাদের সম্পদে আমরা ইচ্ছামত যা করি তা পরিত্যাগ করি? তুমি তো একজন সহনশীল সৎব্যক্তি! (হূদ ৮৭)

হযরত ইউসুফ (আঃ) সম্পদের অভিভাবক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্তির জন্য নিজের যোগ্যতা নির্ধারণ করেছিলেন, (حفيظ عليم) ‘বিশ্বস্ত রক্ষক ও (এ বিষয়ে) বিজ্ঞ’ (ইউসুফ ৫৫) বলে। অর্থাৎ সততা ও দক্ষতাকে। এজন্য ইহুদীরা নিজেদের মধ্যে সূদকে হারাম ঘোষণা করেছিল এবং হযরত ঈসা (আঃ)ও সূদকে নিন্দা করেছিলেন এই বলে যে, ‘তোমরা যখন কাউকে ঋণ দাও তখন বিনিময়ে অতিরিক্ত কিছু প্রত্যাশা করো না’ (লুক ৬ঃ ৩৫)

প্রিয় ভাই ও বোনেরা!

আমাকে প্রায়শঃই একটি ভুল ধারণার মুখোমুখি হতে হয় যে, ইসলামী অর্থনীতি মানেই ইসলামী ব্যাংক। অবশ্য এটা স্বীকার করতেই হবে যে, তিনটি কারণে ইসলামী ব্যাংকিং ইসলামী অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বৃহত্তম অর্জন। তা হ’ল-

  1. 1. ব্যাংকগুলো নিজেরাই বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক কার্যকলাপের রক্তপ্রবাহের মত, যা অর্থনীতির গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করছে।
  2. 2.ইসলামী অর্থনীতির বিভিন্ন নীতিমালার মধ্যে ইসলামী ব্যাংককেই বলা যায় একমাত্র বিষয়, যা বাস্তবতার মুখ দেখেছে এবং কিছুটা হলেও স্বীকৃতি আদায় করতে পেরেছে। যার ফলে ইসলামী ব্যাংকিং তার অস্তিত্ব ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
  3. 3. ইসলামী ব্যাংকগুলো আল্লাহ্র অনুগ্রহে স্থানীয় অর্থনীতির একটি কার্যকরী উদাহরণে পরিণত হয়েছে এবং গণচাহিদার ইঙ্গিতবাহী হয়ে উঠেছে, যা পূর্ণভাবে অর্জিত হতে পারে, যদি ইসলামী অর্থনীতির অন্যান্য নীতিমালাসমূহ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।

আমাদের অর্জন কী-তার একটি যথার্থ ও সঠিক চিত্র তুলে ধরতে আমি আপনাদের ২৫ বছর আগে নিয়ে যেতে চাই, যখন তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিকভাবে সূদভিত্তিক ব্যবস্থাই সর্বত্র বিরাজমান ছিল এবং সূদবিহীন ব্যাংকিং সিস্টেম পরিচালনা প্রায় অসম্ভব মনে হচ্ছিল। লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্ব, প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ এবং ঝুঁকিগ্রহণের মত বিষয়গুলো তখন সম্পূর্ণ কাল্পনিক ব্যাপার ছিল। নিদেনপক্ষে অবাস্তব শ্লোগান মনে করা হ’ত। সেদিনকে পিছনে ফেলে আজকে আমরা সূদের অপরিহার্যতা থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামী ব্যাংকিং-এর সক্ষমতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। ফলে ইসলামী ব্যাংকিং স্বীয় অস্তিত্ব ও গতিশীলতা নিশ্চিত করার সাথে সাথে ভোক্তাদের পারস্পরিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসা, লোকসানের ঝুঁকিগ্রহণ, মৌল উৎপাদনশীল প্রকল্পসমূহে অংশগ্রহণের ধারণার সাথে কার্যকরভাবে খাপ খাওয়ানো এবং সাথে সাথে ব্যাংকের অন্যান্য প্রয়োজনসমূহ মিটানোর ক্ষেত্রে অগ্রণী অবস্থানে চলে এসেছে।

অধিকন্তু নতুন নতুন ফাইন্যান্সিয়াল ইন্সট্রুমেনট উদ্ভাবন, সক্রিয় সেকেন্ডারী মার্কেট, যৌথ বিনিয়োগ ফান্ডের ভূমিকা শক্তিশালীকরণ প্রভৃতি কার্যক্রমকে ইসলামী ব্যাংকগুলি বর্তমানে দক্ষতার সাথে উন্নয়নের চেষ্টা করছে।

সম্মানিত অতিথিবৃন্দ!

১৯৯৭ সালের মে মাস পর্যন্ত এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকার ২৭টিরও বেশী দেশে প্রায় ১৫০টি ইসলামী ব্যাংক এবং ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানসমূহ ৭৫৫ কোটি বা তদূর্ধ ডলার সমমূল্যের বিনিয়োগ কর্মকান্ড পরিচালনা করেছে।

আলহামদুলিল্লাহ বিগত বিশ বছর ধরে চলমান ইসলামী অর্থনীতির মূলনীতিসমূহ, যাকাতের কিছু প্রায়োগিক দৃষ্টান্ত, আর্থিক বাজার ও ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধতির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পর সম্প্রতি আইএমএফ-এর একটি সংবাদ প্রতিবেদন আমার নজরে এসেছে যেখানে বলা হয়েছে, ‘ইসলামী ব্যাংকিং প্রচলিত পাশ্চাত্য ধারার চেয়ে অধিকতর সুপ্রতিষ্ঠিত এবং সম্পূর্ণ ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর কার্যকারিতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।’ এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা এমন এক প্রপঞ্চে পরিণত হয়েছে, যা বৈশ্বিক স্বীকৃতি ও প্রশংসা পেতে শুরু করেছে। যদিও এটা একটা নতুন বিষয় এবং একে নানা বাধা-বিপত্তি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তা সত্ত্বেও তা বিশ্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নিজের অবস্থান গেড়ে নিতে পেরেছে। মোকাবিলা করা বা প্রতিপক্ষীয় মনোভাব নিয়ে নয় বরং ইসলামী ব্যাংকিংকে বাস্তব রূপ দান করা এবং সে লক্ষ্যে ধারাবাহিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নীতিতেই এটা সম্ভব হয়েছে।

সম্মানিত ভ্রাতৃমন্ডলী!

আমি ইসলামী ব্যাংকের বহুবিধ সুবিধা আর অর্জন নিয়ে কোন আলোচনা করতে চাই না। কেননা এসব অর্জন আপনাদের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে। এ ব্যাপারে আমার চেয়ে আপনারাই ভালো জানেন। অধিকন্তু এটাও আমার অভিপ্রায় নয় যে, আপনাদেরকে হতাশ করব এবং এমন একটি গৌরবময় দিন ও আনন্দঘন অনুষ্ঠানকে সমালোচনা আর দোষারোপের মঞ্চে পরিণত করব। তবে ক্রটিমুক্ত হওয়া ও আরো সাফল্য অর্জনের জন্যে সহজাত আগ্রহ থেকে কিছু কথা বলতেই হচ্ছে।

ইতিমধ্যে যা কিছু অর্জিত হয়েছে তা সত্যিই অনেক বৃহৎ ও বিস্ময়কর; কিন্তু তাই বলে এই অর্জনকে আরো বাড়িয়ে নেয়ার সুযোগ কি ছিল না? এই প্রশ্নে এসে আমি একটু থামতে চাই আত্মবিশ্লেষণ এবং আত্মসমালোচনার জন্য। এর উদ্দেশ্য হল সন্তুষ্টি ও আত্মপ্রসাদ লাভের পরিবর্তে আমাদের কার্যক্রমে এখনও যেসব ভুল-ক্রটি রয়ে গেছে তা সংশোধনের প্রতিজ্ঞা করা এবং কার্যক্রমগুলিকে ঢেলে সাজানো। এর উদ্দেশ্য পূর্ববর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে দোষারোপ করা বা অবমূল্যায়ন করা নয়। পথিকৃৎ অন্যান্য সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষার মতই এর বিকাশ ঘটা বাঞ্ছনীয়। স্থবির থাকা আদৌ কাম্য নয়। আমাদের কর্তব্য হল, এর ভুল-ভ্রান্তিগুলো ধামাচাপা না দিয়ে কিংবা অস্বীকার না করে বরং সেগুলোর সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা। এক্ষণে আমি যদি কিছু স্পর্শকাতর বিষয় উত্থাপন করতে চাই, তা ইসলামী ব্যাংকিং অবকাঠামোর উপর পূর্ণ আস্থা রেখেই করতে চাই। কারণ অভ্রান্ত এলাহী বিধি-বিধান থেকেই এর মৌলিক নীতিমালা গৃহীত হয়েছে।

সম্মানিত অতিথিবৃন্দ!

যখন আমরা ব্যাংকিং সেক্টরে ইসলামী মূলনীতিসমূহ প্রয়োগ করার আহবান জানাই, তখন আমাদের কাঁধেই প্রথমে এই নীতিমালাসমূহ অনুসরণের দায় এসে পড়ে। তাই আর্থিক লেনদেনের সত্যিকার ইসলামীকরণ করতে গিয়ে কোন সমস্যা ও বাধা পরিদৃষ্ট হলে আমাদের কোনরূপ দুর্বলতা দেখানো ঠিক হবে না।

আমাদের উচিৎ হবে না কোন জায়েয, অস্পষ্ট বা অনুমোদনযোগ্য ব্যাখ্যার আশ্রয় নেওয়া। বরং উচিৎ হবে, যতদূর সম্ভব শরী‘আতের মূল নির্দেশনাগুলোকেই শক্তভাবে অাঁকড়ে ধরা। এ ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধতির প্রায়োগিক ফলাফল ও প্রচলিত সূদভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের ফলাফলের মধ্যে পার্থক্যটা স্পষ্ট করে দেখানো খুবই যরূরী।

আমাদের অর্থনৈতিক নীতি যে এলাহী উৎসের উপর প্রতিষ্ঠিত তার উপর পূর্ণ আস্থা রেখেই আমরা জনগণকে বলেছি, ইসলামী অর্থনীতি বাস্তবায়নের ফলে মুসলিম উম্মাহ্র অর্থনৈতিক অগ্রগতি, ভ্যাট সৃষ্টি, রফতানী বৃদ্ধি, আমদানী হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অক্ষমদের পুনর্বাসন এবং সক্ষমদের প্রশিক্ষিত করণ ইত্যাদির দ্বারা মুসলিম উম্মাহ্র অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন প্রতিফলিত হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, যদি আমরা সনাতন ব্যাংকগুলোকে অতিমাত্রায় অনুসরণ করি এবং ঝুঁকি গ্রহণ থেকে দূরে সরে থাকি, আর ঝুঁকিমুক্ত নিরাপদ বিনিয়োগকেই প্রাধান্য দেই, তাহ’লে ইসলামী ব্যাংকিং-এর বাস্তব যে সুফলগুলো আসার কথা ছিল, তা আসবে না। এতে ইসলামী ব্যাংকিং ও সনাতন ব্যাংকিং-এর মধ্যকার ফারাকটা আরো হ্রাস পাবে। এটা হবে আল্লাহ প্রদত্ত খেলাফতের দায়িত্বের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতারই শামিল। যা বস্ত্তগত উন্নয়নের পাশাপাশি মুসলিম উম্মাহ্র নৈতিক মূল্যবোধকেও সমুন্নত রাখার দাবী করে।

সুপ্রিয় অংশগ্রহণকারীগণ !

আমি আপনাদেরকে সুস্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই যে, আমাকে যদি সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি পুনরায় শুরু করতে হতো, তাহলে অর্থনীতি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামী শিক্ষা প্রয়োগের জন্য আমি ব্যাংক ব্যবস্থাকে কাঠামো হিসাবে বিবেচনা করতাম না। বরং ভিন্নতর এমন একটি কাঠামো খুঁজতাম, যেখানে বিনিয়োগ কার্যক্রমকে পুরোপুরি শরী‘আতের মূলনীতির ভিত্তিতেই পরিচালনা করা হতো। এর কারণ হ’ল, বর্তমানে আমরা কেবল ‘ব্যাংক’ নাম গ্রহণেই সন্তুষ্ট হইনি, বরং সনাতন ব্যাংকিং-এর মূল ধারণা তথা ‘আর্থিক মধ্যস্থতাকারী’ হিসাবেও একে গ্রহণ করেছি। ফলে আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমরা এমন কোন ধারণা বা পদ্ধতি দেখতে পাই না যা প্রচলিত ‘আর্থিক মধ্যস্থতাকারী’র ধ্যান-ধারণাকে অতিক্রম করেছে। ফলে বাস্তবতা এমন হয়েছে যে, ইসলামী ব্যাংগুলোর গৃহীত বিনিয়োগ পদ্ধতিসমূহ ঋণ ও বিনিয়োগের একটি মিশ্রণে পরিণত হয়েছে। এতে সূদভিত্তিক ঋণের অধিকাংশ বৈশিষ্ট্য এবং পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী পদ্ধতির ক্রটিসমূহ বিদ্যমান। ফলে এটি ইসলামী বিনিয়োগের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে যা ঝুঁকির অংশীদারিত্ব এবং প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের উপর ভিত্তিশীল। ইসলামী পদ্ধতি পুঁজি ফেরৎ বা মুনাফা প্রদানের কোন গ্যারান্টি অনুমোদন করে না।

এই অবস্থার গভীরতা ও চলমান ধারা একটি বিষয় দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়, তা হ’ল আমাদের ব্যাংকের যে ‘অর্গানাইজেশনাল চার্ট’ রয়েছে, যা আমরা সনাতন ব্যাংকসমূহের অনুসরণে তৈরী করেছি, তা পরিমাপ ও বন্টনের ক্ষেত্রে ‘পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট’-এর দিকে কোন নজর রাখে না। ফলে তা সকল প্রকার উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে আত্মীভূত করতে পারে। এভাবে আমরা ক্ষুদ্র পরিসরে একটি কাঠামো তৈরী করে নিজেদেরকে তুষ্ট করেছি এবং আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্রসমূহ এমনভাবে তৈরী করেছি, যা সূদ-ভিত্তিক ব্যাংকসমূহের নিয়মিত কার্যক্রমের সাথে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এর ফলাফল হিসাবে আমরা যা পেয়েছি তা হল, পাশ্চাত্য আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার দিকে যথেষ্ট প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে থাকা সত্ত্বেও বাস্তবিকপক্ষে ইসলামী ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ ব্যবস্থার মৌলিক চরিত্র ও মুখ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধরার ক্ষেত্রে আমরা কোনরূপ সফলতা দেখাতে পারিনি। আমরা আমাদের কর্মকান্ড থেকে বড়জোর সূদকে পরিহার করতে পেরে পরিতৃপ্ত বোধ করেছি। কিন্তু সূদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাস্তবতা ও প্রভাব থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি।

প্রিয় ভ্রাতৃমন্ডলী!

এই ভুল প্রবণতার স্বাভাবিক ফলাফল হল, ফাইন্যান্স চলে যায় সচ্ছল ও ঋণ ফেরত দানে সক্ষম লোকদের নিকট, যারা সকল প্রকার নিশ্চয়তা দানের ক্ষমতা রাখেন। আর আমরা ব্যাংকের কোনরূপ অংশগ্রহণ না রেখে বিনিয়োগ ঝুঁকি এককভাবে চাপিয়ে দিচ্ছি বিনিয়োগকারীর উপর। কোন গ্রাহকের জন্য অর্থ মঞ্জুর করতে গিয়ে আমরা এটা বিবেচনায় নেই না যে, প্রকল্পটির অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা কতটুকু। আমরা কেবল গ্যারান্টি ক্ষমতার নিশ্চয়তা নেই। ব্যবসায় নিয়োজিত অর্থ মুদ্রাস্ফীতির জটিলতা সৃষ্টি করছে কি-না কিংবা তা অগ্রাধিকার ও চাহিদা নীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কি-না তার প্রতি নজর দেই না। এভাবে আমরা আমাদের অজান্তেই ইসলামী ব্যাংকিং-এর মূল ধারণা এবং কৌশলগত উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছি। যা সূদের প্রশ্ন ছাড়াই মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক উন্নতি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে কার্যকরভাবে অংশ গ্রহণ করতে পারত।

সম্মানিত ভ্রাতৃমন্ডলী!

সূদের উপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পিছনে যুক্তি হ’ল, ইসলাম ঝুঁকিগ্রহণকে উৎসাহিত করে (কারণ ঝুঁকিগ্রহণ ও মুনাফা হাত ধরাধরি করেই চলে)।

সুনির্ধারিত গ্যারান্টিযুক্ত মুনাফার উপর নির্ভর করার জন্য ইসলাম নয়। বিষয়টি কোন মেয়াদের সাথেও সম্পর্কিত নয় যে কারবার সম্পন্ন হওয়ার আগে বা পরে সময় নির্দিষ্ট করে মুনাফা প্রদান করা হবে। কেননা ইসলামী ব্যাংকের দুটি বিশেষ নীতি রয়েছে- মুরাবাহা ও ইজারা। এই ঝুঁকি গ্রহণের পিছনে কী দূরদর্শিতা রয়েছে তা পরিষ্কার। কেননা দেশের উন্নতি যা কি না ইসলামে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য, তা অর্জিত হয় আবশ্যকীয় উৎপাদনশীল প্রকল্পসমূহে বিনিয়োগের ঝুঁকি গ্রহণ করার মাধ্যমে। এতে যেমন জনগণের কর্মসংস্থান হয়, তেমনি পণ্যের উৎপাদন ও সেবা প্রদানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয়।

বস্ত্তত: সূদকে পরিত্যাগ করাই সূদের বিরোধিতা করার জন্য যথেষ্ট নয়। কারো অর্থ বা তহবিলকে সূদ থেকে পরিচ্ছন্ন করার অর্থ হ’ল, যে ত্রুটি ছিল তা থেকে উল্টা ফিরে আসা। যাইহোক সত্যের দাবী হল, ব্যবসায়িক উদ্যোগে অংশগ্রহণকারী উভয় পক্ষকেই সমানভাবে ঝুঁকি বহন করতে হবে এবং প্রাপ্তি ও ঝুঁকির ভিত্তিতে অর্জিত লাভ-লোকসান ভাগাভাগি করে নিতে হবে। এটাই হ’ল ‘ইক্যুইটি’ বা সূদবিহীন স্টক শেয়ার, যা প্রচলিত সূদভিত্তিক ঋণ প্রদান পদ্ধতি থেকে মুশারাকাকে পৃথক করে দেয়। প্রচলিত সূদী ঋণের ক্ষেত্রে ঋণদাতা সর্বাবস্থায় তার প্রদত্ত অর্থ সূদসহ ফেরৎ পাবে। পক্ষান্তরে ঋণগ্রহীতা সকল দায়-দায়িত্ব ও ঝুঁকি বহন করবে।

ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রায় সমুদয় কার্যকলাপে ঝুঁকিমুক্ত থাকার প্রবণতা, সাথে সাথে গ্যারান্টিযুক্ত মূলধন বিনিয়োগ ও মুনাফা অর্জনকে অত্যধিক প্রাধান্য দেওয়ায় ইসলামী ব্যাংকিং-এর ব্যাপারে জনগণের মধ্যে সংশয় তৈরী হয়েছে। এই পথ খোলা রাখলে অচিরেই তা সংশয়বাদীদেরকে এই ব্যাংক সম্পর্কে জনমনে সন্দেহ ও প্রতারণার বীজ বপনের সুযোগ করে দেবে। তারা সনাতন ব্যাংকের সূদকে হালাল প্রমাণ করার জন্য আপাতঃদৃষ্টিতে অনেক যৌক্তিক প্রশ্ন অবতারণা করার সুযোগ পাবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, আমরা যদি বর্তমানের পথ ধরে চলা অব্যাহত রাখি, তাহলে ইসলামী ব্যাংকগুলি খুব শীঘ্র তাদের প্রতিষ্ঠা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক উভয় ভিত্তিই হারিয়ে ফেলবে।

সম্মানিত ভ্রাতৃমন্ডলী!

আর্থিক বাজারের একটা বড় অংশ দখলের প্রতিযোগিতাটি হবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। তাই সত্যিকার সাফল্য পেতে হলে যুগ যুগ ধরে যেসব রেডিমেড প্যাকেজ ও ফর্মূলার মধ্যে আমরা আটকা পড়ে আছি তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যারা সঞ্চয় করছে তাদেরকে যদি আমরা টার্গেট করতে চাই তাহলে ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের নিশ্চয়তা প্রদানের সাথে সাথে নতুন কৌশলের মাধ্যমে তাদেরকে আকৃষ্ট করতে হবে।

ইসলামী ব্যাংকসমূহ হাযার হাযার কোটি টাকা নিয়ে ব্যবসা করছে। এখানে শেয়ারহোল্ডারদের তহবিলের পরিমাণ খুবই সামান্য। অথচ তা সত্ত্বেও আমরা দেখি শেয়ারহোল্ডাররা ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ চালিয়ে আমানতকারীদের চেয়ে অধিকতর মুনাফা উঠিয়ে নিচ্ছে। যিনি সঞ্চয়কারী অর্থাৎ এই পুঁজির মালিক, তার ক্ষমতা নেই যে তিনি ‘মুযারিব’কে (এখানে ব্যাংকারকে) কাজে রাখবেন না বিদায় করে দেবেন। তার ক্ষমতা নেই যে তিনি মুযারিবকে এই বিষয়ে কিছু দিক-নির্দেশনা দিবেন, যদিও ইসলামী ফিক্বহ পুঁজির মালিককে সে অধিকার দান করেছে।

আমি মনে করি, এটা ঘটেছে ‘মুযারিব’ কে? তার সংজ্ঞা সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারণার কারণে। শেয়ারহোল্ডাররাই কি ‘মুযারিব’, যেখানে সব সময়েই ব্যক্তির পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকে? না কি শেয়ারহোল্ডারদের নিয়োজিত পরিচালনা পরিষদ, যে বোর্ডেও নিয়মিত পরিবর্তন ও স্থলাভিষিক্তকরণ হয়ে থাকে? না কি নির্বাহী পরিষদই ‘মুযারিব’, যাদের কি না সিভিল আইনে কোন গ্যারান্টি প্রদানের বাধ্যবাধকতা নেই, এমনকি যদি কোন ক্রটি-বিচ্যুতি বা চুক্তি লংঘনের মত বিষয় থাকে তাহলেও? যা ইসলামী ফিক্বহে ‘মুযারাবা’র ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতার বিপরীত। অথবা নির্বাহী পরিষদ কি ব্যাংকের নৈতিক অস্তিত্বের প্রতীক? ফিক্বহ বিশেষজ্ঞদের মাঝে এ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। তবে তাদের কোন সংজ্ঞাই বিনিয়োগ উদ্যোগে জড়িত পক্ষসমূহের পারস্পরিক অধিকার সংক্রান্ত বিতর্কের সমাধান দিতে পারেনি।

এ বিষয়টি আমাকে দু’টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দানে উদ্বুদ্ধ করছে। নিম্নে তা আমি বিস্তারিত বিবরণ ছাড়াই উল্লেখ করছি।-

(১) আমানতকারীদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি পর্যবেক্ষক ও দিকনির্দেশনা প্রদানকারী বোর্ড গঠন করা।

(২) ইসলামী ব্যাংকসমূহের আইনগত কাঠামোকে জয়েন্ট স্টক কোম্পানী থেকে পার্টনারশীপ কোম্পানীতে রূপান্তর করা।

স্বচ্ছতা ও সততার কথা বাদ দিলেও আমানতকারীদের স্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিপণন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য কেবলমাত্র অঙ্গিকারাবদ্ধ আমানতকারীদের আকৃষ্ট করা নয়, যারা মুনাফার স্বল্প হারেই সন্তুষ্ট থাকেন। কেননা এটি এমন এক ত্যাগ, যাতে কিছুটা অস্বস্তি ও অনৈতিকতার ভাব রয়েছে। বরং আমাদের টার্গেট হল সে সকল মানুষ যারা অর্থ সঞ্চয় করেন। তারা ছাড়াও বিশ্বের প্রত্যেক দেশের অমুসলিমদেরও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী আকৃষ্ট করা। এ লক্ষ্যে এমন কিছু নতুন কাঠামো ও প্রক্রিয়াসমূহ উদ্ভাবন করা যরূরী, যা অন্যদের কাছে নেই। এর মাধ্যমে আমরা ভোক্তাদেরকে তাদের স্বার্থ পূরণে আশ্বস্ত করতে পারব এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় নিতে সক্ষম হব।

এই প্রেক্ষিতেই আমি ইতিপূর্বে ফাইন্যান্সিং ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য একটি প্রকল্প তৈরী করেছিলাম যা সেসময় ইসলামী দেশগুলোর দায়িত্বশীলদের নিকটেও প্রেরণ করেছিলাম। যাদের মধ্যে অন্যতম হলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহাম্মাদ আবুল খায়েল। এর মধ্যে ছিল আমানতকারী এবং বিনিয়োগ হিসাবধারীদের একটি যৌথ বোর্ড গঠনের প্রস্তাব। যাতে করে তারা তাদের তহবিল এবং পারস্পারিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবসায়িক তৎপরতার উপর যথাযথ নযরদারি করতে পারে। এতে একাধারে শেয়ারহোল্ডার ও বহিঃসম্পদের মালিক উভয়েরই উদ্দেশ্য হাছিলে সহায়ক হবে। এই বোর্ড গঠিত হবে এমন আমানতকারীদের নিয়ে যাদের সম্পদের পরিমাণ মোট বিনিয়োগ হিসাবের একটি নির্দিষ্ট শতাংশের নীচে হবে না এবং তাদের আমানতের মেয়াদও এক বছরের নীচে হবে না। তারা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে যা তাদের হয়ে নিয়মিত নজরদারী ও তত্ত্বাবধানের কাজ করবে। এদের মধ্য থেকে কয়েকজন বোর্ড অব ডাইরেক্টর্সে নির্বাচিত হবেন। এই  প্রতিনিধি কমিটির পূর্ণ অধিকার থাকবে বোর্ড অব ডাইরেক্টর্সের মিটিং-এ আলোচনায় অংশগ্রহণ করার। তবে তাদের কোন ভোটাধিকার থাকবে না। এই কমিটি আমানতকারী ও বিনিয়োগ  হিসাবধারীদের স্বার্থরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে মতামত প্রদানের পাশাপাশি বাজেট, লাভ-লোকসান ইত্যাদি ব্যাপারেও আলোচনার সুযোগ পাবে। এই সকল কার্যক্রম অবশ্যই পরিচালিত হবে একটি সুশৃংখল পদ্ধতির মাধ্যমে যা কাজে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করেই ক্ষমতার বিন্যাস ও প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তা বজায় রাখতে সক্ষম হবে।

প্রিয় ভাইয়েরা!

ইসলামী ব্যাংকসমূহের আইনী কাঠামো সংশোধনের জন্য আমি যে প্রস্তাবটি দিয়েছিলাম, সেটির পিছনে এই অনুভূতিই কাজ করেছিল যে, ৩য় পক্ষের সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কোন আর্থিক কোম্পানীর উপর থাকা উচিৎ নয়। বরং তা থাকা উচিৎ কোন পার্টনারশীপ কোম্পানীর উপর। বিশেষতঃ যেহেতু বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমানত রাখা ও পার্টনারশীপের বিষয়টি কিছুটা নির্ভর করে ব্যবস্থাপনায় জড়িত ব্যক্তিবর্গের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের উপর, তাই ডিপোজিটর ও শেয়ারহোল্ডারদের মতামত না নিয়েই যদি কোন নীতির পরিবর্তন-পরিবর্ধন সাধন করা হয়, তাতে সেই আস্থায় যে কোন সময় ফাটল ধরতে পারে।

আমি আরো বিশ্বাস করি যে, শেয়ারহোল্ডারদের পুঁজির উপর সীমিত দায়িত্ব নেয়া একটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানী সম্পদ সুরক্ষার জন্য ইসলামের দৃষ্টিতে পুরোপুরি উপযোগী কাঠামো নয়। কেননা ইসলামী মূলনীতি অনুসারে সম্পদ লেনদেনের সময় জামানত গ্রহণ করা আবশ্যক। যা ব্যক্তিগত সম্পদে, এমনকি মুযারাবার ক্ষেত্রেও অপরিহার্য। তাছাড়া দেউলিয়াত্ব, প্রাপ্য বুঝে না পাওয়া ইত্যাদি যেসব ঘটে প্রচলিত ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানীগুলোতে, তাও এ ব্যাপারটি নিয়ে যরূরী ভিত্তিতে পর্যালোচনার দাবী রাখে। যাই হোক আমি আপনাদের সাথে জোরেশোরেই এ চিন্তা করছি যে, জয়েন্ট স্টক কোম্পানীর পরিবর্তে জনগণের সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য পার্টনারশীপ বা যৌথ বিনিয়োগ কোম্পানীর (তাযামুন) মডেলকে একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তোলাই হবে আমাদের অগ্রাধিকারমূলক কর্তব্য।   (চলবে) (দ্বিতীয় পার্ট)