বিদ‘আত ও তার ভয়াবহতা (প্রথম পর্ব)


সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি, তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাই। আমরা নিজেদের আত্মার কুমন্ত্রণা এবং অশুভ কর্ম হ’তে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। তিনি যাকে হেদায়াত দান করেন, তাকে বিভ্রান্তকারী কেউ নেই। আর তিনি যাকে বিভ্রান্ত করেন, তাকে সুপথ প্রদর্শনকারী কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন (প্রকৃত) ইলাহ (উপাস্য) নেই, তিনি এক, তাঁর কোন অংশীদার নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তাঁকে হেদায়াত ও সত্য দ্বীন সহ পাঠিয়েছেন। ফলে তিনি তাঁর উপর অর্পিত বার্তা পৌছে দিয়েছেন এবং দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতির কল্যাণ সাধন করেছেন এবং মৃত্যু অবধি আল্লাহর দ্বীন বাস্তবায়নে যথাযথ চেষ্টা করেছেন। আর তাঁর উম্মতকে রেখে গেছেন এক উজ্জ্বল পথের (সুন্নাতের) উপর, যার রাত্রি দিনের মত, তা থেকে কেবল ধ্বংসপ্রাপ্তরা বিভ্রান্ত হবে। এ উম্মত জীবনের সার্বিক ক্ষেত্রে যে সকল বিষয়ের প্রয়োজন অনুভব করবে, তার সবগুলো তিনি তাতে বর্ণনা করেছেন। আবু যার (রাঃ) বলেন, مَا تَرَكَ النبي صلى الله عليه وسلّم طَائِراً يُقَلِّبُ جَنَاحَيْهِ فِي السَّمَاءِ إِلاَّ ذَكَرَ لَنَا مِنْهُ عِلْماً- ‘আকাশে যে পাখি তার দু’ডানা ঝাপটায় তার জ্ঞান সম্পর্কেও নবী করীম (ছাঃ) আমাদের নিকট আলোচনা করেছেন।[মুসনাদে আহমাদ হা/২১৬৮৯, ২১৭৭০, ২১৭৭১, ২১৩৯৯, ৫ম খন্ড, পৃঃ ১৬৩; ছহীহাহ হা/১৮০৩।]

একজন মুশরিক লোক সালমান ফারেসী (রাঃ)-কে বলল, তোমাদের নবী পেশাব-পায়খানার নিয়ম-কানূন পর্যন্তও তোমাদের শিক্ষা দিয়েছেন। সালমান ফারেসী (রাঃ) বললেন, أَجَلْ لَقَدْ نَهَانَا أَنْ نَسْتَقْبِلَ الْقِبْلَةَ لِغَائِطٍ أَوْ بَوْلٍ أَوْ أَنْ نَسْتَنْجِىَ بِالْيَمِيْنِ أَوْ أَنْ نَسْتَنْجِىَ بِأَقَلَّ مِنْ ثَلاَثَةِ أَحْجَارٍ أَوْ أَنْ نَسْتَنْجِىَ بِرَجِيْعٍ أَوْ بِعَظْمٍ ‘হ্যাঁ, আমাদের নবী (ছাঃ) কেবলামুখী হয়ে আমাদেরকে পেশাব-পায়খানা করতে, তিনটির কম ঢিলা ব্যবহার করতে, ডান হাত দ্বারা ইসতিনজা করতে ও গোবর বা হাড় দ্বারা দিয়ে ইসতিনজা (কুলুখ ব্যবহার) করতে নিষেধ করেছেন’।[মুসলিম হা/২৬২ ত্বহারাতঅধ্যায়।]

আর অবশ্যই আপনি দেখতে পাবেন এই মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা দ্বীনের মৌলিক বিষয় সমূহ ও শাখা-প্রশাখাগত বিষয় বর্ণনা করেছেন। বর্ণনা করেছেন তাওহীদ ও তার সকল প্রকার, এমনকি মজলিস ও অনুমতি প্রার্থনার শিষ্টাচার সম্পর্কেও বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا إِذَا قِيْلَ لَكُمْ تَفَسَّحُوْا فِي الْمَجَالِسِ فَافْسَحُوْا يَفْسَحِ اللهُ لَكُمْ ‘হে মুমিনগণ! যখন তোমাদেরকে বলা হয়, মজলিসে স্থান প্রশস্ত করে দাও, তোমরা তখন স্থান করে দিও, আল্লাহ তোমাদের জন্য স্থান প্রশস্ত করে দিবেন’ (মুজাদালা ৫৮/১১)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لاَ تَدْخُلُوْا بُيُوْتاً غَيْرَ بُيُوْتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوْا وَتُسَلِّمُوْا عَلَى أَهْلِهَا ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنَ، فَإِن لَّمْ تَجِدُوْا فِيْهَا أَحَداً فَلاَ تَدْخُلُوْهَا حَتَّى يُؤْذَنَ لَكُمْ وَإِنْ قِيْلَ لَكُمُ ارْجِعُوْا فَارْجِعُوْا هُوَ أَزْكَى لَكُمْ وَاللهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ عَلِيْمٌ-

‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য কারো গৃহে গৃহবাসীদের অনুমতি না নিয়ে এবং তাদেরকে সালাম প্রদান না করে প্রবেশ করো না। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। অতএব যদি তোমরা গৃহে কাউকে না পাও, তাহ’লে তাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না তোমাদেরকে অনুমতি দেয়া হয়। আর যদি তোমাদেরকে বলা হয়, ফিরে যাও তবে তোমরা ফিরে যাবে। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম। তোমরা যা কর সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত’ (নূর ২৪/২৭-২৮)

এমনকি পোশাক-পরিচ্ছদের আদবও বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ বলেন, وَالْقَوَاعِدُ مِنَ النِّسَاءِ اللَّاتِيْ لاَ يَرْجُوْنَ نِكَاحاً فَلَيْسَ عَلَيْهِنَّ جُنَاحٌ أَنْ يَّضَعْنَ ثِيَابَهُنَّ غَيْرَ مُتَبَرِّجَاتٍ بِزِيْنَةٍ وَأَنْ يَسْتَعْفِفْنَ خَيْرٌ لَهُنَّ- ‘বৃদ্ধা নারী, যারা বিয়ের আশা রাখে না, তাদের জন্য অপরাধ নেই, যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না  করে তাদের বহির্বাস খুলে রাখে; তবে এটা হ’তে তাদের বিরত থাকাই উত্তম’(নূর ২৪/৬০)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِيْنَ يُدْنِيْنَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلاَبِيْبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلاَ يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللهُ غَفُوْراً رَّحِيْمًا- ‘হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মুমিনদের নারীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে। ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু’ (আহযাব ৩৩/৫৯)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِيْنَ مِنْ زِيْنَتِهِنَّ ‘তারা যেন তাদের গোপন আভরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে’ (নূর ২৪/৩১)। অন্যত্র তিনি বলেন, وَلَيْسَ الْبِرُّ بِأَنْ تَأْتُوْاْ الْبُيُوْتَ مِنْ ظُهُوْرِهَا وَلَـكِنَّ الْبِرَّ مَنِ اتَّقَى وَأْتُوْا الْبُيُوْتَ مِنْ أَبْوَابِهَا ‘পিছন দিক দিয়ে তোমাদের গৃহে প্রবেশ করাতে কোন পুণ্য নেই; কিন্তু পুণ্য আছে কেউ তাক্বওয়া অবলম্বন করলে। সুতরাং তোমরা দ্বার দিয়ে গৃহে প্রবেশ কর’ (বাক্বারাহ ২/১৮৯)

এগুলো ছাড়াও অনেক আয়াত আছে যেগুলোর মাধ্যমে উদ্ভাসিত হয় যে, নিশ্চয়ই ইসলাম ধর্ম পরিব্যাপ্ত ও পরিপূর্ণ, অতিরঞ্জনের প্রতি মুখাপেক্ষী নয়। যেমনভাবে তাতে কমতি করার বৈধতাও নেই। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা কুরআনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন, وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَاناً لِّكُلِّ شَيْءٍ ‘আর আমি প্রত্যেক বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা স্বরূপ তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করলাম’ (নাহল ১৬/৮৯)। মানুষ তাদের জীবন-যাপন ও প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে যে সকল বিষয়ের প্রতি মুখাপেক্ষী হয় তার সবগুলোই আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। হয়ত সরাসরি বা ইঙ্গিতে অথবা লিখিতভাবে বা মর্মগতভাবে।

হে ভ্রাতৃমন্ডলী! কতিপয় মানুষ নিম্নের আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা করে বলেন, وَمَا مِنْ دَآبَّةٍ فِي الأَرْضِ وَلاَ طَائِرٍ يَطِيْرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلاَّ أُمَمٌ أَمْثَالُكُم مَّا فَرَّطْنَا فِي الكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ ثُمَّ إِلَى رَبِّهِمْ يُحْشَرُوْنَ- ‘ভূ-পৃষ্ঠে বিচরণশীল জীব এবং নিজ ডানার সাহায্যে উড়ন্ত পাখি তারা সকলে তোমাদের মতই এক-একটি জাতি। কিতাবে (লাওহে মাহফূযে) কোন কিছুই আমি বাদ দেইনি। অতঃপর স্বীয় প্রতিপালকের দিকে তাদেরকে একত্রিত করা হবে’ (আনআম ৬/৩৮)

مَّا فَرَّطْنَا فِي الكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ (কিতাবে কোন কিছুই আমি বাদ দেইনি) অত্র আয়াতটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী বুঝা যায় যে, كتاب দ্বারা উদ্দেশ্য হ’ল কুরআন। কিন্তু সঠিক কথা হ’ল কিতাব অর্থ লাওহে মাহফূয। আল্লাহ তা‘আলা নাসূচক বাক্যের চেয়ে অলংকার পূর্ণভাবে তার পূর্ণাঙ্গতার বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেন, وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَاناً لِّكُلِّ شَيْءٍ ‘আর আমি প্রত্যেক বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা স্বরূপ তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করলাম’ (নাহল ১৬/৮৯)। সুতরাং এ আয়াতটি অধিক পূর্ণাঙ্গতর ও সুস্পষ্ট নিম্নের আয়াত مَّا فَرَّطْنَا فِي الكِتَابِ مِن شَيْءٍ (আনআম ৬/৩৮) থেকে।

সম্ভবতঃ কোন প্রশ্নকারী বলতে পারে, আমরা কুরআনের কোথায় পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের সংখ্যা পাব? কুরআনে প্রত্যেক ছালাতের রাক‘আত সংখ্যা বর্ণিত আছে কি?

আর একথা সঠিক হবে যে, আমরা কুরআনে প্রত্যেক ছালাতের রাক‘আত সংখ্যার বর্ণনা পাব না। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর আমি প্রত্যেক বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা স্বরূপ তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করলাম’ (নাহল ১৬/৮৯)

এর উত্তর হ’ল, আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জন্য তাঁর কিতাবে বর্ণনা করেছেন যে, আমাদের উপর আবশ্যক হ’ল রাসূল (ছাঃ) যা বলেছেন এবং যে বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন তা গ্রহণ করা। আল্লাহ বলেন, مَّنْ يُطِعِ الرَّسُوْلَ فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيْظاً ‘যে রাসূলের আনুগত্য করল সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে মুখ ফিরিয়ে নিল, তোমাকে তাদের উপর তত্তবাবধায়ক প্রেরণ করিনি’ (নিসা ৪/৮০)। তিনি আরো বলেন,وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا وَاتَّقُوا اللهَ إِنَّ اللهَ شَدِيْدُ الْعِقَابِ- ‘রাসূল যা তোমাদের দেন তা তোমরা গ্রহণ কর আর যা হ’তে তোমাদেরকে নিষেধ করেন তা হ’তে বিরত থাক এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তো শাস্তি দানে কঠোর’ (হাশর ৫৯/৭)

অতএব হাদীছে যা বর্ণিত হয়েছে তার প্রতি কুরআনের ইঙ্গিত রয়েছে। কেননা হাদীছ হ’ল দুই প্রকার অহি-র অন্যতম এক প্রকার, যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছেন এবং তাকে শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَأَنْزَلَ اللّهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللهِ عَلَيْكَ عَظِيْماً ‘আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমত অবতীর্ণ করেছেন এবং তুমি যা জানতে না তা তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন, আর তোমার প্রতি আল্লাহর মহা অনুগ্রহ রয়েছে’ (নিসা ৪/১১৩)। এর উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, হাদীছে যা বর্ণিত হয়েছে তা আল্লাহর কিতাবেও বর্ণিত হয়েছে।

ভ্রাতৃমন্ডলী! যখন আপনার নিকট এটা সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হ’ল, তখন বলুন তো নবী করীম (ছাঃ) মারা গেলেন অথচ দ্বীনের এমন কোন বিধান বর্ণনা করা কি তিনি বাকী রাখলেন, যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়?

কখনো না। রাসূল (ছাঃ) দ্বীনের সার্বিক বিষয় সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন, কথা, কর্ম ও সমর্থনের মাধ্যমে। নিজ থেকে প্রথমে সূচনা করে বা প্রশ্নের উত্তর দানের মাধ্যমে। আবার কখনো আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যন্ত মরুভূমি থেকে কোন বেদুঈনকে দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন করার জন্য পাঠিয়েছেন। যে বিষয়ে তাঁর নিত্য সঙ্গী ছাহাবায়ে কেরামও তাঁকে প্রশ্ন করেনি। আর এ কারণে কোন বেদুঈন রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট এসে দ্বীনের কোন বিষয়ে প্রশ্ন করলে ছাহাবায়ে কেরাম খুব খুশী হ’তেন। এটা আপনাকে দেখিয়ে দেয় যে, মানুষ ইবাদতের ক্ষেত্রে, পারস্পরিক লেন-দেনের ক্ষেত্রে ও জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে যে সকল বিষয়ের প্রতি মুখাপেক্ষী হয়, তার সবগুলোই নবী করীম (ছাঃ) বর্ণনা করে গেছেন। এ মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِيْنًا ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম’ (মায়েদাহ ৫/৩)

হে মুসলিম ভাই! আপনার নিকট যখন এটা স্পষ্ট হ’ল তখন জেনে রাখুন, যেকোন ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে কোন নতুন শরী‘আত প্রবর্তন করল, যদিও তা সৎ উদ্দেশ্যে করা হয়, তার এই বিদ‘আত ভ্রষ্টতার সাথে সাথে আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে এক বড় আঘাত বলে বিবেচিত হবে। বিবেচিত হবে আল্লাহর নিম্নের আয়াতের প্রতি মিথ্যা আরোপকারী হিসাবে।الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম’ (মায়েদাহ ৫/৩)। কেননা এই বিদ‘আতী যে আল্লাহর দ্বীনে নতুন শরী‘আত প্রবর্তন করল যা শরী‘আতের অন্তর্ভুক্ত নয়, সে যেন তার স্বরে বলল, দ্বীন পরিপূর্ণ হয়নি। কেননা সে মনে করে, যে বিদ‘আত সে চালু করেছে সে বিষয়ে শরী‘আত অপূর্ণাঙ্গ ছিল, যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। আশ্চর্যের ব্যাপার হ’ল, মানুষ এমন বিদ‘আত চালু করে যা আল্লাহর সত্তা, নাম সূমহ ও গুণাবলীর সাথে সম্পৃক্ত। অতঃপর সে বলে যে, সে ঐ বিষয়ে তার রবের মর্যাদা বর্ণনাকারী, পবিত্রতা বর্ণনাকারী ও সে ঐ বিষয়ে নিম্নের আয়াতের অনুসরণকারী فَلاَ تَجْعَلُواْ لِلّهِ أَنْدَاداً وَأَنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ ‘তোমরা জেনে শুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ  দাড় করিও না’(বাক্বারাহ ২/২২)

এতে আপনি আরো অবাক হবেন যে, সে দ্বীনের মধ্যে এমন বিষয়ে বিদ‘আত সৃষ্টি করে যা আল্লাহর সত্তার সাথে সম্পৃক্ত। যার উপর সালাফে ছালেহীন ও ইমামগণ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন না। অতঃপর সে বলে, সে নাকি আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনাকারী, তাঁর মহত্ত্ব ঘোষণাকারী এবং সে নিম্নে বর্ণিত আল্লাহর বাণীর অনুসরণকারী। فَلاَ تَجْعَلُواْ لِلّهِ أَنْدَاداً ‘তোমরা কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ দাড় করিও না’ (বাক্বারাহ ২/২২)। আর যে ওর (বিদ‘আতীর) বিরোধিতা করে তাকে আল্লাহর গুণের সাথে সাদৃশ্যদানকারী বা এরূপ খারাপ উপাধিতে ডাকে।

অনুরূপভাবে আপনি ঐ সম্প্রদায়ের ব্যাপারে তাজ্জব হবেন যারা আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে সম্পর্কিত এমন বিদ‘আত সৃষ্টি করে যা শরী‘আতের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর এর মাধ্যমে তারা দাবী করে যে, তারা রাসূল (ছাঃ)-কে মহববতকারী এবং তাঁকে মর্যাদা দানকারী। আর যারা তাদের এ বিদ‘আতকে সমর্থন করে না তারা রাসূল (ছাঃ)-কে ঘৃণাকারী। রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে সম্পর্কিত বিষয়ে তারা যে বিদ‘আত সৃষ্টি করে তার বিরোধিতা যারা করে, তাদেরকে এ জাতীয় বিভিন্ন মন্দ নামে তারা ডাকে। আরো বিস্ময়ের ব্যপার হ’ল এ ধরনের লোকেরা বলে, আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মর্যাদা দানকারী। অথচ তারা রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক আনীত শরী‘আত ও দ্বীনের মধ্যে এমন নীতি চালু করে যা শরী‘আতের অংশ নয়। এক্ষেত্রে সেটা হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর সম্মুখে অগ্রণী হওয়ার শামিল। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لاَ تُقَدِّمُوْا بَيْنَ يَدَيِ اللهِ وَرَسُوْلِهِ وَاتَّقُوْا اللهَ إِنَّ اللهَ سَمِيْعٌ عَلِيْمٌ ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রণী হয়োও না এবং আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ (হুজুরাত ৪৯/১)

ভ্রাতৃমন্ডলী! আমি আপনাদেরকে প্রশ্ন করছি এবং আল্লাহর নামে কসম দিয়ে বলছি আর আপনাদের অন্তর থেকে এর উত্তর চাচ্ছি আবেগ থেকে নয়, দ্বীনের দাবীতে; অন্ধ অনুকরণের দাবীতে নয়। আপনি সে সকল লোকের ব্যাপারে কী বলবেন, যারা আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে এমন বিদ‘আত সৃষ্টি করে যা শরী‘আতের অংশ নয়? চাই তা আল্লাহর যাত বা সত্তা, গুণাবলী ও নাম সমূহের সাথে সম্পর্কিত হোক অথবা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে সম্পর্কিত হোক। অতঃপর তারা বলে, আমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ছাঃ)-কে সম্মানদানকারী। প্রকৃতপক্ষে এরা কি আল্লাহর ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-কে মর্যাদা দানকারী; নাকি যারা শরী‘আতের বন্ধন থেকে অঙ্গুলি পরিমাণ বিচ্যুৎ না হয়ে বলে শরী‘আতে যা এসেছে তার প্রতি ঈমান আনলাম, আমাদের যে ব্যাপারে সংবাদ দেওয়া হয়েছে তা বিশ্বাস করলাম এবং আমাদের  যে ব্যাপারে নির্দেশ বা নিষেধ করা হয়েছে তা শ্রবণ করলাম এবং আনুগত্য করলাম। তারা আরো বলে, শরী‘আত যা নিয়ে আসেনি তা আমরা পরিত্যাগ করলাম ও তা হ’তে বিরত থাকলাম? আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রণী হওয়া আমাদের জন্য উচিত নয়। আর আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে এমন কোন কথা বলা উচিত হবে না যা দ্বীনের অংশ নয়। দু’টো দলের কোনটি প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-কে মহববতকারী এবং তাঁদের মর্যাদা দানকারী? নিঃসন্দেহে যারা বলে, আমরা ঈমান আনলাম, শারঈ বিষয়ে আমাদের যা সংবাদ দেওয়া হয়েছে তা বিশ্বাস করলাম ও যে বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার আনুগত্য করলাম। তারা আরো বলে, আমাদের যে বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়নি তা থেকে আমরা বিরত থাকি। তারা এও বলে, আমরা আল্লাহর শরী‘আতের মধ্যে বিদ‘আত সৃষ্টি করাকে আমাদের অন্তরে সামান্যতম স্থান দেইনি অথবা  আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে নতুন নিয়ম-নীতি সৃষ্টি করাকেও না। নিঃসন্দেহে এ সকল লোক নিজেদের মর্যাদা সম্পর্কে অবগত এবং তাদের স্রষ্টার মর্যাদা সম্পর্কেও অবগত। এ সকল লোকেরাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-কে যথার্থ মর্যাদা দান করে এবং তারাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি প্রকৃত ভালবাসা প্রকাশ করে। তারা নয়, যারা আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে বিদ‘আত সৃষ্টি করে যা শরী‘আতের অংশ নয়; যারা বিদ‘আত সৃষ্টি করে বিশ্বাস, কথা ও কর্মের ক্ষেত্রে।

[দ্বিতীয় পর্ব]

Advertisements
This entry was posted in বিদ‘আত ও তার ভয়াবহতা and tagged . Bookmark the permalink.

One Response to বিদ‘আত ও তার ভয়াবহতা (প্রথম পর্ব)

  1. Pingback: বিদ‘আত ও তার ভয়াবহতা (দ্বিতীয় পর্ব) | ইসলামী সাইট

Comments are closed.